
1 May 2020 · BK School of Research · Business and Economics · Sociology and Philosophy
প্রবাসী আয়: উন্নয়নের একটি কার্যকরী হাতিয়ার বিজন কুমার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নির্ধারকগুলোর ধারাবাহিক অগ্রগতি বিশ্বের ব্যাপক নজর কেড়েছে এবং অব্যাহতভাবে কেড়ে যাচ্ছে ।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের সময়ও যেদেশ অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যে ভারাক্রান্ত ছিল; ভরপুর ছিল প্রাকৃতিক সম্পদের অপ্রাচুর্যতায়; উপরন্তু যেদেশে ছিল না কোন উন্নত অবকাঠামো ব্যবস্থা ও দক্ষ মানব সম্পদ, সেদেশ কীভাবে এত দ্রুত এগিয়ে গেল তা সকলের কাছেই বড়ই বিষ্ময়ের।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের এমন বেহাল দশা দেখে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরী কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে একটি “তলাবিহীন ঝুড়ি” বলে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করেছিলেন।কিন্তু নিয়তির কী অদ্ভুত লীলা!
স্বাধীনতার মাত্র ৪৫ বছর পরই ২০১৪ সালে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের-ই রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা একেবারে বিপরীত মন্তব্য করেন।
বলেন- কিসিঞ্জারের মন্তব্য সম্পূর্ণ ভুল ছিল বরং বাংলাদেশ একটি বহু সম্ভাবনার দেশ এবং শীঘ্রই এদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে।
আবার, ২০১৩ সালে জাতিসংঘের এক রিপোর্টেও বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় অর্থনৈতিক সম্ভবনাময় দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।এখন প্রশ্ন হল, এত বড় বড় বাধা-বিপত্তি মোকাবিলা করে বাংলাদেশ কীভাবে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছালো?
এমন অভূতপূর্ব অগ্রগতির পেছনে কোন জাদুর কাঠিরই বা স্পর্শ রয়েছে?এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে কিছু দক্ষ অর্থনীতিবিদ এবং তৎকালীন সরকারের প্রশাসন যন্ত্র সদ্যোজাত বাংলাদেশকে ‘উন্নয়নের পরীক্ষণ’ হিসেবে ধরে বিরাট চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন।
চ্যালেঞ্জগুলো অনেক কঠিন হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের মহান ত্যাগ, অসীম ধৈর্য্য, সুতীক্ষè বুদ্ধি ও দক্ষতা, উন্নত কৌশল ও পরিকল্পনার বলে বিশ্ব মন্দার বিরুপ প্রভাব, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অনিরাপত্তা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের উত্থান, হরতাল-অবরোধ-বন্ধ, অনুন্নত অবকাঠামো ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি শক্তির অপ্রতুলতার মধ্যেও বাংলাদেশ আজ ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে বিশ্ব দরবারে সুপরিচিত।
এই উন্নয়নের পেছনে অনেকগুলো বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।যেমন- কৃষি, শিল্প, সেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রসার; রপ্তানি; প্রবাসী আয়; তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লব ও সর্বস্তরে ব্যবহার ইত্যাদি।এগুলোর মধ্যে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অপরিসীম ও সুদৃশ্যমান।
প্রবাসী আয় কীভাবে উন্নয়নের কার্যকরী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে, এই প্রবন্ধ তা ফুটিয়ে তোলার ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র।প্রবাসী আয় কীভাবে আমাদের অর্থনীতির উন্নয়নকে প্রভাবিত করছে তা জানার পূর্বে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অভিবাসন ও প্রবাসী আয় কী, তা জানা আবশ্যক।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে কোন দেশের শুধু জিডিপি-র প্রবৃদ্ধির হারের সম্প্রসারণকেই বোঝায় না বরং একই সাথে সে দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি; দারিদ্র্য ও আয় বৈষম্যের হ্রাস ইত্যাদির সম্মিলিত অবস্থাকে বোঝায়।
অর্থাৎ কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলে সে দেশের প্রবৃদ্ধির হারের বৃদ্ধির সাথে সাথে উন্নতি ঘটে লেনদেন ভারসাম্যে, অবকাঠামো ব্যবস্থায়; হ্রাস পায় দারিদ্র্য ও আয় বৈষম্য সূচক।অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে অভিবাসন ওতোপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত।
সাধারণভাবে, অভিবাসন বলতে জনগণের এক দেশ হতে অন্যদেশে স্থানান্তরকে বোঝায়।স্থানান্তরতি হওয়া ব্যক্তিদের প্রবাসী বা অভিবাসী বলা হয়।আর এসব অভিবাসী বিদেশে থেকে কাজ করে দেশে পরিবারের নিকট যেসব অর্থ বা সম্পদ পাঠায় তা প্রবাসী আয় নামে পরিচিত।যাইহোক, মূল কথায় ফেরা যাক।
কেন লোকজন অভিবাসন করে?কারণ হল, বাংলাদেশ একটি অতি ঘনবসতিপূর্ণ জনসংখ্যার দেশ।যেখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ১২৬৬ জন লোক বাস করে।উপরন্তু, উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় দেশের অধিকাংশ লোক গ্রামে বাস করে এবং কৃষির উপর নির্ভরশীল।
এজন্য গড় মাথাপিছু আয়ও কম (১৬০২ মার্কিন ডলার)।বাংলাদেশের বিশেষত: গ্রামীণ জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।অধিকাংশ ক্ষেত্রে, তাদেরকে দারিদ্র্য ও নি¤œ জীবনযাত্রার কঠোরতার জাঁতাকলে পড়ে পিষ্ট হতে হয়।আবার কখনো কখনো তারা মৌলিক অধিকার মেটাতেও সক্ষম হয় না।
তাই, ভাল কর্মসংস্থান লাভ ও আয় উপার্জনের জন্য প্রতি বছর বাংলাদেশ হতে অনেক লোক বিদেশ গমন করছে।বিশ্ব ব্যাংক (২০১৬)-র মতে, অভিবাসনের দিক হতে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম এবং প্রবাসী আয় অর্জনের দিক হতে দশম।
এ দেশের জনগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অভিবাসন করে।তাদের মধ্যে সৌদিআরব, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত উল্লেখযোগ্য।এছাড়া এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতেও অভিবাসন করে।তবে তার পরিমাণ অনেক কম।
বাংলাদেশের অভিবাসনের ইতিহাস একেবারে সাদামাটা বা নতুন নয়।বরং বৈচিত্র্যময়।১৯৭৬ সাল হতে দেশটি বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি করে আসছে।৬০৮৭ জন অভিবাসীর মাধ্যমে দেশটি অভিবাসনের ইতিহাস সূচনা করে।যা বর্তমানে ১০ মিলিয়নে এসে দাঁড়িয়েছে।
২০১৬ সালে এ দেশ হতে ৭৫৭৭৩১ জন লোক বিদেশে অভিবাসন করেছে এবং ২০১৭ সালে জুন মাস পর্যন্ত অভিবাসন করেছে ৫২০৪৯০ জন।৫৯ বিলিয়ন-ডলারে।৬০ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় অর্জন করে।৬০ বিলিয়ন ডলার।
ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, অভিবাসন এবং প্রবাসী আয় অর্জন উভয়ই ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে।প্রবাসী আয়ের প্রবাহের প্রভাব আমাদের অর্থনীতির ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক উভয় ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্যময়।
ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, প্রবাসী আয় প্রবাহ সরাসরি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে পারিবারিক বাজেট প্রতিবন্ধকতা হ্রাস করছে ।এই প্রবাসী আয় দ্বারা অভিবাসী পরিবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোগ ব্যয় পূরণ করছে।
কিছু অংশ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করে যা স্থানীয় শ্রমের ও দ্রব্যসামগ্রীর চাহিদা বৃদ্ধি করছে।একই সাথে অত্র এলাকায় নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে যা বেকারত্ব লাঘব করছে।
এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাণিজ্যিক চাষাবাদ, পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি খাতে প্রবাসী আয় বিনিয়োগের ফলে দেশের শিল্প-কলকারখানা ও আর্থ-সামাজিক অবকাঠামোর বেশ উন্নয়ন ঘটছে।
পাশাপাশি অভিবাসী পরিবারের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে উপস্থিতির হার বৃদ্ধি করছে, বৃদ্ধি করছে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা গ্রহণ এবং হ্রাস করছে শিশু মৃত্যুহার।এক কথায়, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ দারিদ্র্য হ্রাস করছে এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নতি ঘটাচ্ছে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈচিত্র্যময়।বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও লেনদেন ভারসাম্যের উন্নতিতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
বিশ্ব ব্যাংকের এক রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও প্রবাসী আয়ের অবদান অনস্বীকার্য।৫৯ বিলিয়ন ডলার।৮০ বিলিয়ন ডলার।৯৭ বিলিয়ন ডলার।৮৭ বিলিয়ন ডলারে।উল্লেখ্য, বাণিজ্য ভারসাম্য হল লেনদেন ভারসাম্যেরই একটি অংশ।
অভিবাসন ও প্রবাসী আয় প্রবাহ দেশ ও সমাজের শুধু কল্যাণই বয়ে আনে না বরং এর জন্য কিছু নৈতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যয়ভারও বহন করতে হয়।যেমন- প্রবাসী আয় অভিবাসী পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করে যা লোকজনকে অলস করে তোলে।
অভিবাসনের ফলে শিশুরা পিতৃ¯েœহ থেকে বঞ্চিত হয়, কখনো কখনো নৈতিক অধঃপতনের দরুণ সংসার ভেঙ্গে যায়।অনেক ক্ষেত্রে পরিবারে পুরুষ লোকের অনুপস্থিতির কারণে মহিলারা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে মানসিক সমস্যায় পড়ে।
এছাড়া, অভিবাসনের কারণে মেধার পাচার ঘটে যা দীর্ঘকালীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ও জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।অন্যদিকে, প্রবাসীরা অভিবাসনকালে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়।যেমন- উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, বিলম্ব যাত্রা, দালালদের খপ্পর ইত্যাদি।
আবার, আমাদের দেশের অধিকাংশ অভিবাসী অশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত, অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ।অন্যদিকে, তাদের পেশাগত ও কারিগরী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেই বললেই চলে।এজন্য বাংলাদেশের অভিবাসীরা ভারত বা চীনের অভিবাসীদের চেয়ে কম মজুরি পায়।
অপরদিকে, বৈধ পথে অভিবাসন করা এবং অর্থ পাঠানো ব্যয়বহুল হওয়ায় প্রবাসীরা অবৈধ পথ ব্যবহার করেছে।ফলে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যে হারে বাড়ার কথা সে হারে বাড়ছে না।একইসাথে, অভিবাসীদের পড়তে হয় নানা ঝামেলায়।
আবার, প্রবাসী আয় হতে প্রাপ্ত অর্থ অভিবাসী পরিবারগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভোগের উদ্দেশ্যে ব্যয় করছে।ফলে প্রকৃত অর্থে দারিদ্র্য কমছে না, প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।
উপরের আলোচনা হতে এটা পরিস্কার যে, কিছু সীমাবদ্ধতা ছাড়া প্রবাসী আয় দেশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখছে।সুতরাং, প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি কার্যকরী হাতিয়ার।
তারপরও সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের নীতি নির্ধারণী মহলে বেশ জোড়েশোরে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।
যদি এভাবে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমতে থাকে তাহলে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার সম্ভবনা দেখা দিতে পারে এবং দেশ বিশাল সমস্যায় নিমজ্জিত হতে পারে।সুতরাং, এমন অবস্থা ঘটার পূর্বেই এ ব্যপারে ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন।
সঠিক কারণ উদ্ঘাটনপূর্বক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজলভ্য করা প্রয়োজন, আবশ্যক প্রবাসী আয় অর্জন বৃদ্ধি এবং তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা ।
কারণ, এসডিজি লক্ষ্যসমূহ অর্জনের পাশাপাশি ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে এবং দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে ধারবাহিক প্রবাসী আয় অর্জনের কোন বিকল্প নেই।লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, অর্থনীতি বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।
com প্রকাশিত: দৈনিক আলোকিত ভোর (১২ ডিসেম্বর, ২০১৮)

